ডন ব্র্যাডম্যান, অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটের রুপকথা

স্যার ডোনাল্ড জর্জ ব্র্যাডম্যান। অনেকে যাকে দ্য ডন নামে চেনে। তাকে বলা হয় ইতিহাসের সেরা ব্যাটসম্যান। আর পরিসংখ্যানও সে কথাই বলছে, তার টেস্ট ব্যাটিং গড় ৯৯.৯৪। শেষ ম্যাচে মাত্র ৪ রান করলেই তার গড় হতে পারতো ১০০!

১৯০৮ সালের ২৭ আগস্ট সাউথ ওয়েলসের কোওটামুন্ড্রার বাউরালে জন্ম মহারথী এই অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটারের। তখন কে জানতে এই শিশু সারা বিশ্বের কাছে এক নামে পরিচিত হবেন।

ডনের শৈশব কেটেছে বাড়ির পেছনের বারান্দায় একটা স্ট্যাম্প দিয়ে ছোট্ট একটা গলফ বলকে ক্রমাগত পিটিয়ে। এটিই এখন অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেটের রুপকথা।

অস্ট্রেলিয়ার জার্সিতে ব্র্যাডম্যানের অভিষেক ১৯ বছর বয়সে ১৯৩০ সালে। সেই ম্যাচে অবশ্য তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয় তাকে। অস্ট্রেলিয়া দল দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ৬৬ রানে গুটিয়ে যায় ও ৬৭৫ রানের বিশাল ব্যবধানে পরাজিত হয়। যা এখন পর্যন্ত রেকর্ড। সেই ম্যাচে তিনি রান করেছিলেন ১৮ ও ১। ফলে পরের ম্যাচেই বাদ পড়তে হয় তাকে।

পরে মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে সিরিজের তৃতীয় টেস্টে মাঠে নামেন ব্র্যাডম্যান। ৭৯ ও ১১২ রানের ইনিংস খেলে সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে টেস্ট সেঞ্চুরি করেন।

তবে ব্র্যাডম্যানের কথা বলতে গেলে বলতে হয় ‘বডিলাইন’ সিরিজের কথা। ১৯৩০-এর সিরিজে সাত ইনিংসে স্যার ডন রান তুললেন ৯৭৪। অ্যাশেজ ফিরিয়ে আনতে ডগলাস জার্ডিনের নেতৃত্বে ইংল্যান্ড হ্যারল্ড লারউডের আশ্রয় নিল ‘বডিলাইন’ নামক অপকৌশলের। ক্রিকেট ইতিহাস এটি অন্যতম বিতর্কিত ঘটনা।

সেদিনের খেলা শেষে পুলিশ আসে। লারউড জিজ্ঞাসা বলছেন, ‘আমি তো জোরে বল ছুড়েছি মাত্র, মানুষ তো মারিনি।’ জবাবে পুলিশ জানায়, ‘গ্রেফতার নয়, আপনাকে নিরাপত্তা দিতে এসেছি। আপনি বাইরে বের হলেই পাবলিক আপনাকে মেরে ফেলবে’। লারউডের রানআপের প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে সঙ্গে ‘এমসিসি’র ৩৩ হাজার ক্ষুদ্ধ দর্শক চেঁচিয়েছে। এই ঘটনা দুই দেশের কূটনীতিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলে।

১৯৪৮ সালে আগস্ট মাসেই শেষবারের মতো ব্যাট হাতে নেমেছিলেন ব্র্যাডম্যান। ১৪ আগস্ট ওভালে ছিল অ্যাশেজের সেই ম্যাচটি। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ডের গার্ড অব অনারে অভিভূত ব্র্যাডম্যান কেঁদে ফেলেছিলেন সেদিন। মাত্র চার রান করলেই গড় হত ১০০। অথচ দ্বিতীয় বলে শূন্যতে বোল্ড হলেন এরিক হোলিসের বলে।

ক্রিকেট ক্যারিয়ারে তার অপূর্ণতা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে ৯৯ দশমিক নয় চার গড় সংখ্যাটি। ২৩৪টি প্রথম শ্রেণির খেলায় ৯৫ দশমিক এক চার গড়ে ২৮ হাজার ৬৭ রান এবং ৫২ টেস্টের ক্যারিয়ারে ছয় হাজার ৯৯৬ রান করেছেন। সেঞ্চুরি ২৯টি।

ব্র্যাডম্যানের ক্যারিয়ার যখন মধ্যগগনে। ঠিক তখনই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গন তখন ৮ বছর থমকে থাকে। নাহলে হয়তো আরও অর্জন ঝুলিতে থাকতো তার।

এরপরেও ব্র্যাডম্যানের অর্জনের পাল্লাটা বেশ ভারী। ১৯৪৯ সালে পান সম্মানসুচক ‘নাইটহুড’। উইজডেন বিশ্ব সেরা হন দশবার। যা এখন পর্যন্ত রেকর্ড। অবসরের প্রায় ৫০ বছর পর ১৯৯৭ সালে অস্ট্রেলীয় প্রধানমন্ত্রী জন হাওয়ার্ড তাকে ‘সর্বশ্রেষ্ঠ জীবিত অস্ট্রেলীয়’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। ডাকটিকিট ও মুদ্রায় ব্র্যাডম্যানের প্রতিচিত্র উপস্থাপন করা হয়। ২০০৮ সালে তারিখে রয়্যাল অস্ট্রেলিয়ান মিন্ট কর্তৃপক্ষ তার প্রতিকৃতিসহ $৫ ডলার মূল্যমানের স্বর্ণমুদ্রা প্রকাশ করে। ২০০৯ সালে আইসিসি ক্রিকেট হল অব ফেমে তাকে মরণোত্তর অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছিল।

২০০১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ৯২ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন স্যার ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যান।

বেস্ট বায়োস্কোপ

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: