একজন বারী সিদ্দিকী

বেস্ট বায়োস্কোপ, ঢাকা: লাখ লাখ ভক্তের মনকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন প্রখ্যাত সংগীত শিল্পী ও বংশীবাদক বারী সিদ্দিকী। রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। সঙ্গীত নিয়ে সারাজীবন কাটানো এই শিল্পী দীক্ষা নিয়েছে বিখ্যাত সব ওস্তাদদের কাছ থেকে। তার অনেক গান ব্যাপক জনপ্রিয়। বাঁশিবাদক হিসেবেও তার খ্যাতি দেশজুড়ে।

বিভিন্ন দেশি সংবাদমাধ্যম তাকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করছে। সেখান থেকেই তুলে ধরা হলো বারী সিদ্দিকী সম্পর্কে কিছু অজানা তথ্য।

১৯৯৯ সনে মাঝে মাঝে বারী সিদ্দিকীকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস এলাকায় দেখা যেত সন্ধ্যার পর। তখনও এতোটা জনপ্রিয় তিনি ছিলেন না। হুমায়ুন আহমেদ এর কয়েকটি গানে তিনি সবে মাত্র কন্ঠ দিয়েছেন, বাশি বাজিয়েছেন। শ্রাবন মেঘের দিনে ছবিতে তিনি গানে কন্ঠ দিয়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান।
হবিগঞ্জ হািইকোর্টের এক আইনজীবী ফেসবুক স্ট্যাটাসে বলেন, ‘আমি একবার সন্ধ্যার পর শাহবাগ এলাকায় বারী সিদ্দিকীকে দেখেছি। অনেক মানুষের মধ্যে তার গলার আওয়াজটাই আলাদা। বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ তার বাঁশির ভক্ত, গানের ভক্ত। বারী সিদ্দিকীর আদলে গান গেয়ে অনেকেই আজ জনপ্রিয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জনকারী বারী সিদ্দিকীর মেয়ে এ্যালমা সিদ্দিকী বিদেশে পড়াশুনা করেছেন। এ্যালমা সিদ্দিকীও একজন বাউল শিল্পী। বাবার সাথে একাধিকবার একই মঞ্চে একই টিভি শোতে গান করেছেন এ্যালমা সিদ্দিকী।

২ ভাই এক বোনের মধ্যে বারী সিদ্দিকী সবার ছোট। ১৯৫৪ সালে নেত্রকোনা জেলায় তার জন্ম। এ্যালমা সিদ্দিকী বলেছেন-তার বাবার উপার্জনের প্রায় সবটুকুই বাড়ি নির্মাণে ব্যয় করেছেন। নেত্রকোনা জেলায়ই বারী সিদ্দিকীর বাড়ি। বাড়ির নাম বাউল বাড়ী। “তুমি আইও পরানের বন্ধু আইও বাউল বাড়ী” শিরোনামে একটি গানও রয়েছে তার। নারী কন্ঠের গানটি বারী সিদ্দিকী গাইয়েছেন তার মেয়ে এ্যালমা সিদ্দিকীকে দিয়ে।

আর “শুয়াচান পাখি” গান শুনে পুরো স্টেজের অনেকেই কেঁদেছেন এমন দৃশ্যও দেখা গেছে।  গান সম্পর্কে বারী সিদ্দিকী বলেছেন- আব্দুর রশিদ নামের এক বাউল শিল্পী গান করতে গঞ্জে যান। এসে দেখেন তার স্ত্রী মারা গেছেন। লাশ কবরে নামিয়ে দেয়া হয়েছে। কবরে লাশ রেখে ওই বাউল নিজের অজান্তেই স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে গানটি গেয়েছেন। সেই গানটি দেশের সেরা গানে পরিণত হয়েছে বারী সিদ্দিকীর কন্ঠে।

বারী সিদ্দিকী একমাত্র বংশীবাদক যিনি জেনেভার একটি কনভেনশনে বাশি বাজানোর জন্য দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে নির্বাচিত হয়েছিলেন। বারী সিদ্দিকীকে প্রশ্ন করা হয়েছিল “আপনার বেশির ভাগ গান বিরহের, কোন্ অতৃপ্তি থেকে আপনি এসব গান গেয়েছেন?” জবাবে বারী সিদ্দিকী জানান- আমার কোনো দুঃখ নেই, কষ্ট নেই, আমি কোনো কিছু হারাইনি। বরং আমি যা পেয়েছি তা অনেক বেশি। এতো কিছু না পেলেও হতো। বারী সিদ্দিকীর কোনো অতৃপ্তি কি আছে? না, এক্ষেত্রেও বারী সিদ্দিকী জানান-আমার কোনো অতৃপ্তি তো নাই ই, বরং দেশবাসী আমাকে যা দিয়েছে, এর কোনো যোগ্যতাই আমার নেই। “আমার গায়ে যত দুঃখ সয়” গানটি বারী সিদ্দিকীর অনবদ্য সৃষ্টি।

অনেকে বলে থাকেন- বারী সিদ্দিকীর একটি খারাপ নেশা রয়েছে। নিজেকে লুকাননি বারী সিদ্দিকী। তিনি গান রচনা করেছেন “আমার মন্দ স্বভাব জেনেও তুমি, কেন চাইলে আমারে, এতো ভাল হয় কি মানুষ নিজের ক্ষতি করে”। এই গানটি সম্পর্কে বারী সিদ্দিকী বলেছেন “ গানটি আমার জন্য তৈরি করেছিলাম। অনেকে গানটি না গাওয়ার কথা বলেছিলেন। উপ মহাদেশের কেউ এভাবে নিজের মন্দ স্বভাব বলে গান করেনি। আমি করেছি, ভাবলাম আমার জন্য গানটি করেছি, আমিই শুনব, সেই গানটিও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে”।

বংশীবাদক বারী সিদ্দিকীর শতশত বাঁশি আছে। মৃত্যুর পর বাড়িতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাঁশির কী হবে। এনিয়ে একটি গান করেছেন বারী সিদ্দিকী। বলেছেন- আমার অনেক বাঁশি আছে। মৃত্যুর পর লাশ কবরে রাখার সময় কিছু বাঁশের প্রয়োজন হয়, কেন বাশের চাটাই দেবেন, আমার বাঁশি দিয়েই চাটাই বানিয়ে দেয়া যাবে। তা না হলে বাঁশি দিয়ে ভেলা বানিয়ে আমার লাশটি জলে ভাসিয়েও দেয়া যাবে। শুধু বাঁশি বাজিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা শতশত শ্রোতাকে বসিয়ে রাখার এক জাদুকর বারী সিদ্দিকী।

বেশ কিছু দিন থেকেই নতুন বেশে বারী সিদ্দিকীকে জাতি দেখছে। লম্বা দাড়ি, পাঞ্জাবি, মাথায় টুপি। গত সপ্তাহে বারী সিদ্দিকী হঠাৎ হার্ট এ্যাটাক করলে তাকে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে তার চিকিৎসা চলে। বারী সিদ্দিকীর দুটি কিডনিও অকার্যকর ছিল। দুই বছর ধরেই তার ডায়ালাইসিস চলছিল।

বারী সিদ্দিকী ১৯৫৪ সালের ১৫ নভেম্বর নেত্রকোনায় জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে পরিবারেই গান শেখায় হাতেখড়ি হয় তার। ১২ বছর বয়সেই নেত্রকোনার শিল্পী ওস্তাদ গোপাল দত্তের অধীনে তার আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ শুরু হয়। তিনি ওস্তাদ আমিনুর রহমান, দবির খান, পান্নালাল ঘোষসহ অসংখ্য গুণী শিল্পীর সান্নিধ্য লাভ করেন।

ওস্তাদ আমিনুর রহমান একটি কনসার্টের সময় বারী সিদ্দিকীকে দেখে তাকে প্রশিক্ষণের প্রস্তাব দেন। পরে ছয় বছর ধরে তিনি ওস্তাদ আমিনুর রহমানের অধীনে প্রশিক্ষণ নেন।

সত্তরের দশকে জেলা শিল্পকলা একাডেমির সঙ্গে যুক্ত হন বারী। ওস্তাদ গোপাল দত্তের পরামর্শে ক্লাসিক্যাল মিউজিকের ওপর পড়াশোনা শুরু করেন। পরে  বাঁশির প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন ও বাঁশির ওপর উচ্চাঙ্গসঙ্গীতে প্রশিক্ষণ নেন। নব্বইয়ের দশকে ভারতের পুনে গিয়ে পণ্ডিত ভিজি কার্নাডের কাছে তালিম নেন। দেশে ফিরে এসে লোকগীতির সঙ্গে ক্লাসিক মিউজিকের সম্মিলনে গান গাওয়া শুরু করেন।

দীর্ঘদিন সংগীতের সঙ্গে জড়িত থাকলেও বারী সিদ্দিকী কণ্ঠশিল্পী হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি পান ১৯৯৯ সালে হ‌ুমায়ূন আহমেদের ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ ছবিটি মুক্তি পাওয়ার পর। এই ছবিতে তার গাওয়া ছয়টি গানই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

বেস্ট বায়োস্কোপ বিনোদন
২৪ নভেম্বর ২০১৭

Comments

comments

Leave a Reply

97 Shares
Share via
%d bloggers like this: